দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্বের খুব কম দেশই জাপানের মতো এত ঘন ঘন এবং এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। এর প্রধান কারণ দেশটি পৃথিবীর ভূত্বকের চারটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই প্লেটগুলো ক্রমাগত সরে যাওয়ায় ভূগর্ভে প্রচুর শক্তি জমা হয়, যা একসময় ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্তি পায়।
এ ছাড়া জাপান প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে থাকা প্রায় ২৫ হাজার মাইল দীর্ঘ ‘রিং অব ফায়ার’-এর মধ্যে অবস্থিত। বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এবং অধিকাংশ বড় ভূমিকম্প এই অঞ্চলে সংঘটিত হয়।
সম্প্রতি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কুমামোতো অঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছেন।
ভূমিকম্পের পর একটি বিপণিবিতান আংশিক ধসে পড়ে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের পর ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া একটি কাগজ কারখানার কয়েকজন কর্মীও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, ‘অনেক মানুষ এখনও সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন, প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ।’
জাপানের জন্য ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসজুড়ে দেশটি বহু ভয়াবহ ভূমিকম্পের সাক্ষী। ১৪৯৮ সালের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৩০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
১৯২৩ সালের গ্রেট কান্তো ভূমিকম্পে রাজধানী টোকিওর বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
১৯৮০-এর দশকে জাপান কঠোর ভবন নির্মাণবিধি চালু করে। ১৯৯৫ সালের কোবে ভূমিকম্পে দেখা যায়, নতুন বিধিমালা অনুযায়ী নির্মিত ভবনগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর দেশটি ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো, জরুরি সাড়া ব্যবস্থা এবং পুরোনো ভবন সংস্কারে ব্যাপক বিনিয়োগ করে।
তবু প্রযুক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ৯ দশমিক ১ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিহত হন এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনারও সূত্রপাত হয়।
২০২৪ সালে পশ্চিম জাপানের নোতো অঞ্চলে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পেও ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬ বা তার বেশি মাত্রার বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ ভূমিকম্প জাপান বা এর আশপাশে সংঘটিত হয়। তাই ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের তুলনায় জাপানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি।
জাপানকে ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রস্তুত দেশগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। দেশটিতে ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত ভূমিকম্প ও উদ্ধার মহড়ায় অংশ নিতে শেখানো হয়।
তবে দেশটির সামনে এখনও বড় ঝুঁকি রয়ে গেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নানকাই ট্রাফ এলাকায় ৮ থেকে ৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ‘মেগাথ্রাস্ট’ ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। যদিও এই পূর্বাভাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের সঠিক সময় আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সর্বদা প্রস্তুত থাকা, দুর্বল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং জনগণের মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলার সচেতনতা বাড়ানো।
/অ